[১]
ব্রিটিশ আগমনের পূর্বে মোঘল আমল পর্যন্ত প্রায় ৬০০ বছর ধরে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ফার্সি শব্দ ব্যবহার হতো;আর মৌখিক ভাষার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাতেও বাংলা-আরবি-ফার্সি এই তিন ভাষার মিশ্রণ ছিল। তো আরবি-ফারসি মিশে যে নতুন ভাষা তৈরি হয় সেটাকে বলা হতো ❝চলতি ভাষা❞।
অনেকে বলতো ❝মুসলমানি ভাষা❞ বা ❝মুসলমানি বাংলা❞। এই বাংলায় শুধু যে মুসলমানরা কথা বলতো এমন না সেটা তখন সাধারণ জনমানুষের ভাষা হয়ে গিয়েছিল।
[২]
পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে যখন ব্রিটিশরা ক্ষমতা দখল নিতে শুরু করে তখন আদালতে “ফারসি” তুলে দিয়ে প্রবেশ করায় “ইংরেজি” ভাষা। এখন এটা তো গেল প্রশাসন সংক্রান্ত ব্যাপার।
অন্যদিকে মুখের ভাষা বাংলা তো রয়ে গেলো এখনো আরবি আর ফার্সি। সেইটাও তুলে ফেলতে ব্রিটিশরা কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ১৮০০ সালে। William Carey (একজন মিশনারি) ছিলেন বাংলা বিভাগের প্রধান। তার নেতৃত্বে বাংলা থেকে আরবি-ফারসি শব্দগুলো বিদায় করে সেখানে সংস্কৃত শব্দগুলো প্রবেশ করানো হয়। গবেষকরা এর নাম দিয়েছেন ❝বাংলা ভাষার সংস্কৃতায়ন❞।
পরবর্তীতে এর ই আদলে রবীন্দ্রনাথ,শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,বিভূতি-ভূষণ বন্দোপাধ্যায় সহ প্রমুখ কলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবিরা ব্যাপক আকারে সাহিত্য,কবিতা,উপন্যাস রচনা শুরু করে। আর পর পর ই আস্তে আস্তে আরবি-ফার্সির প্রভাব বাংলা ভাষায় কমতে থাকে এবং বাংলা-সংস্কৃতের মিক্সচারে একটা নতুন গঠন তৈরি হয় বাংলা ভাষাতে। আর এর ই নাম হচ্ছে ❝আধুনিক প্রমিত বাংলা❞।
[৩]
যেটার প্রমাণ পাওয়া যায় আহমদ ছফার বই এও,
অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক আহমদ ছফাকে বলেছিলেন,
❝আধুনিক বাংলা ভাষাটা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা সংস্কৃত অভিধান দেইখ্যা দেইখ্যা বানাইছে। আসল বাংলা ভাষা এইরকম আছিল না। আরবি ফারসি ভাষার শব্দ বাংলা ভাষার লগে মিশ্যা ভাষার একটা স্ট্রাকচার খাড়া অইছিল। পলাশির যুদ্ধের সময়ের কবি ভারতচন্দ্রের রচনায় তার অনেক নমুনা পাওয়া যাইব। ব্রিটিশ শাসন- চালু অইবার পরে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা আরবি ফারসি শব্দ ঝাঁটাইয়া বিদায় কইর্যা হেই জায়গায় সংস্কৃত শব্দ ভইর্যা থুইছে। বাংলা ভাষার চেহারা কেমন আছিল, পুরানা দলিলপত্র খুঁইজ্যা দেখলে কিছু প্রমাণ পাইবেন।
আমি বললাম, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা যে গদ্যরীতিটা চালু করেছিলেন, সেটা তো স্থায়ী হতে পারে পারেনি। বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এসে বাংলা গদ্যের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এবং রূপান্তর ঘটে গেছে। পরিবর্তন ত অইছে। কিন্তু কীভাবে অইছে এইটা দেখন দরকার।
আমি জানতে চাইলাম, কীভাবে পরিবর্তনটা হয়েছে। স্যার বললেন, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা ভাষার স্ট্রাকচারটা খাড়া করেছিলেন, তার লগে ভাগীরথী পাড়ের ভাষার মিশ্রণে আধুনিক বাংলা ভাষাটা জন্মাইছে। আধুনিক বাংলা বঙ্গসন্তানের ঠিক মুখের ভাষা না, লেখাপড়া শিইখ্যা লায়েক অইলে তখনই ওই ভাষাটা তার মুখে আসে।❞
উপরের বক্তব্য দেখে আশা করি এখন বুঝতে পারছেন কেন উর্দূ কে জিন্নাহ স্টেট ল্যাংগুয়েজ রাখতে বলছিলেন। এটার একটা মাত্র কারণ ছিল কলকাতার প্রভাব কমানো। কিন্তু জিন্নাহ ব্যর্থ হয়েছিল। আর ফলাফল স্বরূপ এখনো আমরা কালচারাল ডমিনেন্স কলকাতার ই দেখতে পাই।যার কারণে এখনো আমরা ব্যবহার করি, ❝আধুনিক প্রমিত বাংলা❞।
References
১) প্রাচ্যবাদের ইতিকথা
২) যদ্যপি আমার গুরু